
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্যতম কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলটির নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।
১৯৯৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে। প্রথম মেয়াদেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৯৮ সালে ইউনেসকো শেখ হাসিনাকে Félix Houphouët-Boigny Peace Prize প্রদান করে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। এরপর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে ছিল বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণাকে কেন্দ্র করে সরকারি সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে নেওয়া উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন শেখ হাসিনাকে ICTs in Sustainable Development Award প্রদান করে। আইটিইউ তাঁর নেতৃত্বে ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল সংযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তিকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নীতি ও অভিযোজনমূলক উদ্যোগও তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি শেখ হাসিনাকে Champions of the Earth পুরস্কারে ভূষিত করে। UNEP তাঁকে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতি দেয়।
নারীর ক্ষমতায়ন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষার বিস্তার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকেও তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে জলবায়ু ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রগতির বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন শেখ হাসিনা।
রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখিতেও তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জীবন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতন্ত্র, দারিদ্র্য এবং নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং চার দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু অভিযোজন এবং সামাজিক কর্মসূচির বহু অধ্যায় জড়িয়ে আছে।
২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ৮০তম জন্মদিনে তাই নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুতনয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অর্জিত স্বীকৃতিগুলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার দীর্ঘ নেতৃত্ব নিজেই একটি বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।